Welcome, Guest   [ Register | Sign In | Take a tour | Adult Filter: On ]

গাঁধী ও মহিলা

গাঁধী ও মহিলা
যখন গাঁধী ভারতের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন, তখন ভারতীয় মহিলাদের গড় আয়ুষ্কাল ছিল 27 বছর৷ শিশু এবং গর্ভবতী/অন্তঃসত্ত্বার অল্প বয়সে মৃত্যুর আশঙ্ক্ষা ছিল বেশি৷ বাল্যবিবাহ ছিল খুবই সাধারণ এবং বিধবাদের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি৷ শুধুমাত্র 2 শতাংশ মহিলা ছিলেন শিক্ষিত এবং মহিলাদের নিজস্ব কোন পরিচিতি ছিল না৷ উত্তর ভারতে, আবরণ প্রথা প্রচলিত ছিল৷ শুধুমাত্র পুরুষদের সাথেই তাঁরা বাইরে বের হতেন এবং তাঁদের মুখ থাকত কাপড়ে ঢাকা৷ যে ভাগ্যবতীরা স্কুলে যেতে পেতেন তাঁদের আবৃত গাড়িতে (টাঙ্গা) যেতে হত৷


এই পরিস্থিতিতে গাঁধীর জাদু আমাদের বুঝতে হবে৷ গাঁধী দাবি করেন যে একজন মহিলা একজন পুরুষের সমান এবং তা দৃঢ়ভাবে পালন করতেন৷ সহস্র এবং লক্ষাধীক মহিলা, শিক্ষিত এবং অশিক্ষিত, গৃহবধূ এবং বিধবা, ছাত্র এবং বয়ষ্ক তাঁর অনুপ্রেরণায় ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন৷ গাঁধীর কাছে স্বাধীনতা আন্দোলন শুধুমাত্র রাজনৈতিক ছিল না; এটি ছিল জাতীয় মাত্রায় অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সংস্কারও৷ কিছু দশক পরে, এই সমতা ভারতে খুব সাধারণ হয়ে ওঠে৷ ভারতের স্বাধীনতা লাভের পরে এবং সংবিধান রচনার পরে, মহিলার সমতার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়.


মহিলা এবং উন্নতি
গাঁধী বিশ্বাস করতেন যে নারী এবং পুরুষের মধ্যে শুধুমাত্র শারীরিক পার্থক্যই রয়েছে এবং তাঁর লেখায় একাধিক বার উল্লেখ করেছেন যে অনেক বিষয়ে বিশেষত সহ্যক্ষমতা, ধৈর্য্য এবং আত্মত্যাগের দিক থেকে ভারতীয় মহিলারা পুরুষদের থেকে এগিয়ে৷ আপনারা তাঁর বই "যুব ভারত" এবং "হরিজন" পড়লে সেকথা জানতে পারবেন৷ তিনি তাঁর 40 বছরের রাজনৈতিক জীবনে যা খুঁজে পেয়েছেন তা তাঁর বিশ্বাস আরও দৃঢ় করেছে৷ মহিলাদের জন্য তাঁর কোন বিশেষ পরিকল্পনা ছিল না, কিন্তু তাঁর সমস্ত পরিকল্পনাতে মহিলাদের মুখ্য ভূমিকা ছিল৷ আমার মনে হয় এটি মহিলাদের তাঁর পরিকল্পনায় যোগাদানের একটি কারণ৷

গাঁধী ঘোষণা করেন যে বাড়ির থেকে ভালো স্কুল আর কোথাও নেই এবং পিতামাতাই সবথেকে ভালো শিক্ষক৷ তিনি বলেন নারী ও পুরুষ সমান কিন্তু অভিন্ন নয়৷ "বুদ্ধিগতভাবে, মানসিকভাবে এবং শক্তির দিক থেকে, মহিলা একজন পুরুষের সমান এবং তিনি সকল ক্রিয়াকলাপে অংশগ্রহণ করতে পারেন৷"

ভারতীয় সমাজ হল পুরুষ প্রধান৷ গাঁধী তাঁর আত্মজীবনীতে বিশ্লেষণ করেছেন তিনিও কীভাবে তাঁর বৈবাহিক জীবনের শুরুতে তাঁর স্ত্রীর উপর কর্তৃত্ব করতে চেয়েছিলেন৷ তিনি প্রায়ই বলতেন পিতৃ প্রধান সমাজই অসমতার প্রধান কারণ৷ তাঁর বইতে, একটি ভীষণ হৃদয়স্পর্শী অধ্যায় রয়েছে যেখানে তিনি তাঁর স্ত্রীকে একটি সর্বজনীন প্রসাবাগার পরিস্কার করার কথা বলেন এবং তার ফলস্বরূপ তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর মধ্যে হওয়া দ্বন্দ্বের কথা রয়েছে৷ তিনি তাঁর নিজের প্রতি লজ্জিত হওয়ার কথা লিখেছেন এবং বাকি জীবনে কখনও আঘাত না করার উপর নজর দেন৷ বুদ্ধির দিক থেকে তাঁর এবং তাঁর স্ত্রীর মধ্যে বিরাট পার্থক্য থাকলেও, এটি তাঁদের পারিবারিক জীবনে কোন প্রভাব ফেলেনি৷ তিনি বলেন যে কস্তুরবা তাঁর স্বামীকে প্রত্যাশার বেশি অনুসরণ করতেন৷ গাঁধী খুব কম বয়স থেকেই ব্রম্ভচর্য পালন করতেন, কিন্তু তাঁর স্ত্রী মারা গেলে, গাঁধী শোক প্রকাশ করেন যে তাঁর স্ত্রী না থাকলে তাঁর জীবন অর্থহীন হত৷ এটাই ছিল তাঁদের 62 বছরের বন্ধন৷

নারী এবং সমাজ সেবা
গাঁধী মহিলাদের শারীরিক এবং মানসিক কষ্ট বুঝতে কঠোর পরিশ্রম করেন৷ খুব কম বয়েসেই তিনি তাঁর স্ত্রী এবং পুত্রদের সমাজের
সেবায় নিয়োগ করেছিলেন৷ তাঁর মতে ভোগ অথবা প্রদর্শনের জন্য নয় আত্মসম্পৃক্তির জন্যই সেবায় যোগ দিতে হয়৷ তিনি মনে করতেন কোন ব্যক্তির সমাজ সেবায় তাঁর অবদানের জনসমক্ষে প্রচার আসলে সেবার মূল্য হ্রাস করে৷ তিনি কাজের ভিত্তিতে মর্যাদা এবং জাতের ভিত্তিতে বিভেদ মেটানোর অনেক চেষ্টা করেন৷ তিনি নাপিত, ধোবি এবং দরওয়ানদের জানতে তাদের কাজ করেছিলেন এবং বলেন যে কোন ব্যক্তির কাজের সমাজে তাঁর মর্যাদার উপর কোন প্রভাব নেই৷ আমার কাছে, যে ব্যাপারে তাঁর বিশাল অবদান ছিল সেটি হল তাঁর সন্তানদের মধ্যে আধুনিক ধারণার বিকাশ ঘটানো৷ একবার ধাত্রী তাঁর স্ত্রীর বাচ্চা প্রসবের সময় উপস্থিত না হলে তিনি নিজেই সেই কাজ করেন৷ তিনি তাঁর স্ত্রীকে বাচ্চাদের খাওয়াতে, স্নান করাতে এবং প্রসাব পরিস্কারে হাত লাগাতেন৷ বর্তমানকালে পশ্চিমী দেশগুলিতে প্রসবকালে পুরুষদের তাঁদের স্ত্রীদের সাথে থাকলে বলা হয়৷ গাঁধী এই অত্যাধুনিক ধারণা 90 বছর আগেই তাঁর পরিবারে পালন করেন৷

নারীর ভূমিকা

নারীত্ব রান্না ঘরেই আবদ্ধ নহে. রান্না ঘরেই বন্দি দশা থেকে মুক্তি পেলেই তাঁর সত্যিকারের উত্সাহ মুক্তি পারে৷ এর অর্থ এটা নয় যে মেয়েরা রান্না করবে না কিন্তু তাঁদের সেই দায়িত্ব অন্যদেরও ভাগ করে নিতে হবে. তিনি চাইতেন যে মহিলারা ঐতিহ্যগত দায়দায়িত্ব গ্রহণ করার পাশাপাশি দেশের স্বার্থে অংশগ্রহণ করুক. পরিবারের পুত্র সন্তান নেওয়ার প্রবণতার তিনি নিন্দা করেন. তিনি মনে করতেন যতদিন না আমরা ছেলে ও মেয়েদের মধ্যের বিভেদ তুলে না দেব ততদিন আমরা অন্ধকারে থাকব.

শিশু ও বিধবা
গাঁধী বিশেষভাবে অল্প বয়সী বিধবাদের কথার উল্লেখ রেখেছেন. বিগত 80 বছরে আমাদের দেশ যদি অল্প বয়সী বিধবাদের ক্ষেত্রে কোন প্রগতি করে থাকে, তার মূলে রয়েছে গাঁধী ও তার সময়ের মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণের ফল. মেয়েদের খুব অল্প বয়সে বিয়ে দেওয়া হত এবং স্বামীদের অসময়ে মৃত্যু তাঁদের জীবনে নিদারুণ কষ্ট টেনে আনত. গাঁধী তাঁর সমগ্র ভারত ভ্রমণে এমন কোন 13 বছরের ও অবিবাহিত মহিলা দেখেননি. তিনি ঘোষণা মেয়েদের সাথে আলোচনা না করেই তাদের বিবাহ দেওয়া অনৈতিক. মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির আওতায় অল্প বয়সী বিধবা মহিলাদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল. তিনি যুবকদের বিধবাদের বিবাহ করার এবং শিশুদের বিবাহ বয়কটের ডাক দেন. গাঁধী নিজে মাত্র 13 বছর বয়সে বিবাহ করেন. ভারতের ইতিহাসে এমন অনেক যুবকের নাম রয়েছে যাঁরা বিধবাদের বিবাহ করেছিলেন এবং সামাজিক সংস্কারকের ভূমিকায় দেখা যায়.

সমাজের নিম্ন বর্গের মহিলা
গাঁধী সমাজের নিম্ন শ্রেণির মহিলাদের অবস্থা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন. বেশ্যালয়ের শিশুদের উপর ঘটতে থাকা অত্যাচার তাকে ব্যথিত করে. তাদের পুনঃপ্রতিষ্ঠার ব্যাপারে তিনি এক ব্যাপক পরিকল্পনা নেন. তাঁর বই "মহিলা এবং সামাজিক ন্যায়" এ গভীর চিন্তার প্রতিফলন ঘটেছে এবং এর সমাধানের পথ খোঁজা হয়েছে. তাঁর ধারণা ছিল যে ভারতে স্বাধীন হলে এই শ্রেণীর মহিলাদের বিলুপ্তি ঘটবে. দেবদাসী প্রথা খাতায় কলমে উঠে গেলেও মহিলাদের যৌন কর্মী হিসাবে অত্যাচার আজও সমানে চলে আসছে. আধুনিক পথগুলির (কল গার্ল, ফোন সেক্স ইত্যাদি) ব্যাপারে গাঁধী ভবিষ্যতবাণী করে যেতে পারেননি কিন্তু তিনি এর সামাজিক কুপ্রভাবের ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন এবং এর বিরুদ্ধে লড়াইও চালিয়েছিলেন.

ভারতীয় মহিলাদের প্রগতিতে গাঁধীর ভূমিকা
আমরা ভারতীয় ইতিহাসের দিকে তাকালে এবং তাঁর আর্বিভারের আগে এবং পরের অবস্থার মধ্যে তুলনা করলে, পরের দিকের প্রগতি চোখে পড়ার মতো. গাঁধীর লক্ষ্যে অনুপ্রাণিত হয়ে মহিলারা নেত্রীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন. আজকের দিকে যে মহিলারা অফিসে, শিক্ষায়তনে, কলকারখানায় কাজ করছেন তার ভিত্তি রচিত হয়েছিল 90 বছর আগে গাঁধী এবং তাঁর সহযোগীদের হাত ধরেই.
পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে, গাঁধী ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের একটি অংশ হিসাবে মহিলাদের প্রগতিকেও সামিল করেছিলেন. আজও অনেক অসামঞ্জস্য রয়ে গেছে কিন্তু নারী পুরুষের সমানাধিকার গুরুত্ব পাচ্ছে. ভারতীয় হিসাবে আমরা বলতে পারি যে অনেক উন্নত দেশেও এটিকে সেভাবে গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয় না. ব্রিটেন ও আমেরিকায় 75 বছর আগে মহিলাদের ভোট দেবার অধিকার ছিল না. কিন্তু আমাদের দেশে তার ব্যতিক্রমই ঘটেছে. আজ থেকে 100 বছর আগে পশ্চিমী দেশের মহিলারা সম্পত্তি কিনতে, বিবাহ বিচ্ছেদ করতে পারতেন না. কিন্তু আমাদের দেশে রাজনৈতিক, অথনৈতিক এবং ভোই দানের অধিকার স্বাভাবিকভাবেই সংবিধানের হাত ধরে এসেছে.


আজ গাঁধীর চিন্তাভাবনা ভারতীয় রাজনীতির কবলে এসে গুরুত্ব হারাচ্ছে. ধারাবাহিকভাবে মহিলাদের উপর অত্যাচারের পিছনে রয়েছে নীতিগত দিক থেকে আমাদের অবনতি এবং নিদারুণ দারিদ্র. আমাদের মধ্যে সমাজ সেবা, কাজের গুরুত্ব, এবং আত্মভরসার অবমূল্যায়ন ঘটেছে. আমাদের মধ্যে থেকে কিছু মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে গাঁধীর অসমাপ্ত কাজ হাত তুলে নেওয়ার জন্য.
অস্বীকরণ